ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাকস্বাধীনতা pdf book

ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা
সপ্তম ও অষ্টম শতকের ইউরোপীয় লেখকদের রচনা, বিশেষ করে লক (Locke) ও রুশো (Rousseau)-এর লেখায় মৌলিক অধিকারের উৎস পাওয়া যায়। তাঁরা তাঁদের গ্রন্থে প্রাকৃতিক আইন
ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা মোহাম্মদ হাশিম কামালি
প্রকাশনীঃ বিআইআইটি
বইয়ের সাইজঃ ৭-এমবি
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৪০০
বিভাগঃ ইসলামে অধিকার
কৃতজ্ঞতায়ঃ বাগী কুঞ্জালয় পাঠাগার

মত প্রকাশের অধিকার ও মৌলিক অধিকার

আমি যে প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চাই, সে সম্পর্কে প্রায় প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়ে থাকে, কিন্তু বিষয়ের লেখকদের রচনায় তার জবাব খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলামী আইনে এটি হল স্বীকৃতির প্রশ্ন অথবা বাধ্যবাধকতার বিপরীত। স্বাভাবিকভাবে পরবর্তী প্রশ্ন হল: বিশেষ মৌলিক অধিকার সাধারণ অধিকারের থেকে পৃথক কি-না এবং তা শরীয়ার আওতায় টিকতে পারে কিনা। এগুলো ও পদ্ধতিগত গুরুত্বপূর্ণ আরও কতিপয় বিষয়-মুসলিম আইন বিশারদদের রচনায় আলোচিত হয়নি। তাই এসবের কোন দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়নি। আমি এর কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি এবং নিম্নে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি, যদিও এ বিষয়টি এ গ্রন্থের মূল আলোচনার জন্য জরুরি নয়; তৎসত্ত্বেও আধুনিক সাংবিধানিক আইনের কতিপয় সুপ্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্যের পদ্ধতিগত দিক ও তার তুলনা করা এ ক্ষেত্রে বিবেচনার দাবি রাখে।

মৌলিক অধিকারের প্রেক্ষাপট

সপ্তম ও অষ্টম শতকের ইউরোপীয় লেখকদের রচনা, বিশেষ করে লক (Locke) ও রুশো (Rousseau)-এর লেখায় মৌলিক অধিকারের উৎস পাওয়া যায়। তাঁরা তাঁদের গ্রন্থে প্রাকৃতিক আইন ও সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবসা বাণিজ্যের-অর্থনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রাকৃতিক অধিকার সম্পর্কে অনেকটা ভাসা ভাসা ও খসড়া ধারণা গ্রহণ করেন আমেরিকান মহাদেশে বসতি স্থাপনকারীরা। তারা সেখানে এ ধারণাকে আরও পরিশীলিত করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী কালে এর আরও সংশোধন করা হয়। মার্কিন বিচারকরা প্রায় দেড়শ' বছর ধরে এসব অধিকারের আরও সংশোধন করেন। এ ঘটনা দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ও জনগণকে প্রভাবিত করে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৩০টি মানবাধিকারের একটি তালিকা অনুমোদন করে যাতে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার বোধসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মৌলিক অধিকার ও অন্যান্য অধিকারের পার্থক্যের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যসমূহ উভয়ই পরিবর্তনপ্রবণ। কেননা এতে কোন বিশেষ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের বিষয় প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ পাশ্চাত্যের আইনের দর্শন প্রসঙ্গে বলা যায় যে, Blackstone তার ব্যক্তি স্বাধীনতার আলোচনায় বাকস্বাধীনতার বিষয় উল্লেখ করেননি। এবং তিনি অন্যায় ও বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে যেখানে আলোচনা করেছেন; সেখানেই রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তার অনন্য অনুচ্ছেদটি। 'ব্যক্তির অধিকার' (Right of person) নিয়ে আলোচনাকালে ব্লাকস্টোন দুর্দশা লাঘবের জন্য রাজা অথবা সংসদের কাছে আবেদন জানানোর অধিকারের বিষয় উল্লেখ প্রসঙ্গে বাকস্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন।

সংবিধান প্রসঙ্গে অন্যান্য পর্যবেক্ষণে ডাইসী (Dicey) স্বীকার করেছেন যে, বৃটিশ আইনে 'বাকস্বাধীনতা' বা 'সংবাদপত্রের স্বাধীনতা'র মতো বিষয় তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। তিনি লিখেছেন, 'ইংল্যান্ডে আলোচনার স্বাধীনতা কোন কিছু লেখা বা বলার স্বাধীনতার চেয়ে তেমন ভিন্নতর কিছু নয়, যাতে ১২ জন দোকানীর সমন্বয়ে গঠিত জুরি মনে করেন যে, বলার অথবা লেখার সুযোগ থাকা উচিত।' এ বিবৃতিতে সংখ্যালঘু অথবা ধর্মের পরিপন্থি কোন মতামত প্রকাশকে একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা

হিসবাহ্ সম্পর্কে কুরআনের মূলনীতি

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ (আমর বিল মারুফ ওয়াল-নাহি'য়ান আল-মুনকার) পবিত্র কুরআনের এমন একটি মূলনীতি; যাতে অনেক ইসলামি আইন ও বিধিবিধানের মূল নিহিত রয়েছে। খোদ ইসলামের বর্ণনায় এ মূলনীতি হচ্ছে শরীয়ার সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য ও সরকারের ক্ষমতার নৈতিকতার প্রাণকেন্দ্র।
অতএব নাগরিকগণ তাদের বিচার বিবেচনায় যেটাকে ভাল বলে গণ্য করবেন, তা বলবেন এবং তদনুসারে কাজ করবেন অথবা কোন খারাপ কিছু হতে দেখলে; তারা তা কথা ও কাজের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করবেন অথবা মনে মনে ঘৃণা পোষণ করবেন। হিসবাহ বলে পরিচিত কুরআনের এ মূলনীতি কতিপয় মৌলিক স্বাধীনতার ভিত্তি প্রদান করেছে; যা থেকে আধুনিক সংবিধানের মূলনীতির অনেক বিষয় রূপায়িত হয়েছে। হিসবাহ'র পরিধি এতোটা ব্যাপক যে, একে কেবলমাত্র মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, হিসবাহ'র ধারণায় এ স্বাধীনতাপ্রদান গুরুত্ব পেয়েছে, একথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বস্তুত এটি হচ্ছে এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাকস্বাধীনতা ছাড়া সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ধারণা করা হবে একটি অচিন্তনীয় বিষয়। হিসবাহ'র ব্যাপকতর ক্ষেত্র ও উপলক্ষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে পাওয়া যায় বিচারক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের রচনায়। হিসবাহ'র পূর্ণাঙ্গ আলোচনা আমার তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য বহির্ভূত হওয়ায় আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে হিসবাহ'র প্রাসঙ্গিক বিষয়ে এখানে আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। অবশ্য আলেমগণ হিসবাহ'র প্রয়োগ যেভাবে করেছেন, সংক্ষেপে সে কথা বর্ণনা করে আমি এ মূলনীতি থেকে নির্যাস গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টি যুক্তিগ্রাহী হিসেবে পেশ করেছি। ইমাম গাযালী হিসবাহকে "ধর্মের বৃহত্তম স্তম্ভ" (আল-কুত্ব আল-আযম ফি'ল দীন) বলে আখ্যায়িত করে বলেন, আল্লাহর প্রেরিত ওহির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হচ্ছে এটি। তাই সমগ্র ধর্মের মূলকথা হচ্ছে হিসবাহ। একে পুরোপুরি উপেক্ষা করলে ধর্মের বিপর্যয় ঘটবে এবং দুর্নীতি ও অজ্ঞতার ব্যাপক বিস্তার ঘটবে। ইবনে কাইয়িম আল জাওযিইয়াহর দৃষ্টিতে ইসলামে সকল সরকারি কর্তৃত্বের (জামি' আল-বিলায়াত) মৌলিক উদ্দেশ্য হয়ে রয়েছে হিসবাহ। ইসলাম একে সম্মিলিতভাবে অবশ্য করণীয় কাজ (ফরযে কেফায়া) বলে গণ্য করেছে। প্রত্যেককে নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী এতে অংশগ্রহণ করতে হবে।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url