pdf download ইসলামী সমাজে মজুরের অধিকার

ইসলামী সমাজে মজুরের অধিকার
সর্বহারা ও মজলুম মানুষকে তাহারা হীন, নীচ ও মানবতার কুলাংগার বলিয়া মনে করে। অন্য কথায়, দরিদ্র আর সর্বহারা হইয়া যেন তাহারা মস্তবড় অপরাধ করিয়া বসিয়াছে ।
নারী ও পুরুষ ভুল করে কোথায় মাওলানা আবদুর রহীম
প্রকাশনীঃ খায়রুন প্রকাশনী
বইয়ের সাইজঃ ১-এমবি
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩৫
বিভাগঃ ইসলামে অধিকার
কৃতজ্ঞতায়ঃ বাগী কুঞ্জালয় পাঠাগার


মালিকানা সম্পর্কে দুইটি মত: অর্থ ও সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। একটি ব্যক্তিগত মালিকানা এবং অপরটি সম্পত্তির জাতীয়করণ। ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার ব্যক্তিকে পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা দান করিয়াছে। যে কোন উপায়ে হউক না কেন, সে যত সম্পদ এবং যত সম্পত্তিই উপার্জন করিবে, তাহাকে সে একান্তভাবে নিজের মালিকানাধীন মনে করিতে পারিবে। উপার্জনের এই নিরংকুশ স্বাধীনতা ব্যয়ের ব্যাপারেও তাহাকে পূর্ণ নিরংকুশ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করিয়া তোলে। কাজেই তাহার উপার্জিত অর্থ ও সম্পত্তি যেভাবে যে পথে এবং যত পরিমাণেই সে ইচ্ছা করিবে, অনায়াসেই তাহা খরচ করিতে পারিবে; কিংবা এক বিন্দু খরচ না করিয়া তিল-তিল করিয়া তাহা সঞ্চিত করিয়া রাখিলেও তাহাতে কাহারো আপত্তি করা চলিবে না। এক কথায়, ব্যয় করা বা সঞ্চয় করিবার ব্যাপারে এই মত ব্যক্তিকে পূর্ণ আজাদী দান করিয়াছে। বস্তুত ইহাকেই বলে ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার। বর্তমান যুগের পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের নিশানবর্দারগণ এই মত সমর্থন করিয়া থাকে। আর সত্য বলিতে কি, অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গির মারাত্মক পরিণতি দীর্ঘকাল ধরিয়া সমগ্র দুনিয়াকে শোষিত নিষ্পেষিত এবং দুঃখ ও দারিদ্রের দুঃসহ জালায় জর্জরিত করিয়া রাখিয়াছে। ইহা মানুষকে অমানুষিক স্বার্থপরতা ও নির্মম অর্থপূজা শিক্ষা দিয়াছে। এই ব্যবস্থা পুঁজিপতি ও সম্পদশালীদের স্বাতন্ত্র্যবাদ ও শ্রেষ্ঠত্ব বোধে দীক্ষিত করিয়া বিশাল বিশ্ব-মানবতার ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছে। দুঃখিতের আহাজারী আর ব্যথিতের মর্মবিদারী ফরিয়াদ তাহাদের কর্ণকুহরে মাত্রই পৌঁছায় না। বিপন্ন ও ব্যথিত মানুষ যখন তাহাদের সম্মুখে এক বিন্দু করুণা লাভের আশায় হস্ত প্রসারিত করিয়া সাহায্য ও সহানুভূতি পাইবার জন্য করুণ নেত্রে তাহাদের প্রতি তাকায়, তখন তাহারা ইহাদের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না।

এই সব দরিদ্র, সর্বহারা ও মজলুম মানুষকে তাহারা হীন, নীচ ও মানবতার কুলাংগার বলিয়া মনে করে। অন্য কথায়, দরিদ্র আর সর্বহারা হইয়া যেন তাহারা মস্তবড় অপরাধ করিয়া বসিয়াছে। এই ধরনের লোক যখন কোন কারখানার মালিক হইয়া বসে, তখন মজুর-শ্রমিকদিগকে তাহাদের শোষণ ও নিষ্পেষণের অগ্নিজ্বালায় ভস্ম করিতে থাকে। আবার ইহারা যখন জমিদার ও জোতদার হইয়া বসে, তখন প্রজা-কৃষকগণ তাহাদের নিকট নিরস্তর লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত হইসেন থাকে। আর রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব যখন ইহারা লাভ করে, তখন নিন সরকারী কর্মচারী হইতে শুরু করিয়া দেশের কোটি কোটি বাসিন্দা খা বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রভৃতি মানুষের বুনিয়াদী প্রয়োজন হইতে সম্পূর্ণ হইয়া যায় এবং তাহাদের বঞ্চিত রেখে বিপুল জাতীয় সম্পদকে ইহারা নিজেদের বিলাস-ব্যাসন, লোভ ও লালসা এবং নিরবচ্ছিন্ন সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের অগ্নি শিখায় আহুতি দেয়। ইসলামী সমাজে মজুরের অধিকার

অস্বাভাবিক মালিকানা নীতির পরিণাম

বস্তুত ব্যক্তিগত মালিকানার এই অস্বাভাবিক নীতির এটাই মারাত্মক পরিণতি। এই নীতি আজ দুনিয়ার সকল পুঁজিবাদী দেশে প্রচণ্ড রূপ ধারণ করিয়াছে। কারণ মানুষ যখন নিজেকে কোন জিনিসের নিরংকুশ, প্রকৃত একক মালিক এবং সর্বময় স্বত্বাধিকারী বলিয়া মনে করিতে থাকে, তখন তাহার সংকীর্ণ দৃষ্টি ও স্বভাবগত মূর্খতা তাহাকে কৃপণ, লোভী ও অর্থগৃগ্ধ করিয়া তোলে। বর্তমান দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ধর্মহীন গণতন্ত্রে ইহার বাস্তব নিদর্শন সুস্পষ্টরূপে দেখিতে পাওয়া যায়। রাজতন্ত্র একনায়কত্ববাদ আর সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়ার বুকে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র অপেক্ষাও মারাত্মক ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করিয়াছে। ইহার একমাত্র কারণ এই যে, রাজা বা সম্রাট নিজেকে তাহার বিশাল রাজ্য বা সাম্রাজ্যের এবং সমগ্র উপায়-উপাদানের একমাত্র ও প্রকৃত মালিক বলিয়া মনে করিয়াছে। ফলে দেশে যাবতীয় ধন-সম্পদ ও উপায়-উপাদানকে কেবলমাত্র নিজের ব্যক্তিস্বার্থের কাজে ব্যয় করিয়াছে। আর কোটি কোটি জনগণের স্বার্থ, প্রয়োজন এবং কল্যাণসাধনকে সে একেবারেই উপেক্ষা করিয়াছে।

আরও বই ডাউনলোড করুন
কোরআন হাদীস সংকলনের ইতিহাস - একেএম এনামুল হক ডাউনলোড
মুসলমানের নিকট আল কুরআনের দাবী ডাউনলোড
আল কুরআনে অর্থনীতি pdf download ডাউনলোড

পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে যারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব লাভ করে, তাহারা মনে করে যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তত্ব প্রকৃতপক্ষে তাহাদের নিজস্ব নয়, বরং দেশের জনগণই প্রকৃত কর্তৃত্বের মালিক- তাহাদের নিকট এই কর্তৃত্ব আমানত স্বরূপ অর্পণ করা হইয়াছে মাত্র। এই মনোভাবের কারণই গণতন্ত্রের অধীন মানুষ রাজতন্ত্র একনায়কত্ববাদ বা সাম্রাজ্যবাদ অপেক্ষা অধিকতর শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভকরিয়া থাকে। কিন্তু জনগণের রষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের একচ্ছত্র মালিক হওয়ার ধারণাটাও মূলত ভুল এবং অচিরে তাও মারাত্মক আকার ধারণ করিয়া বসে। রাজতন্ত্র একনায়কত্ববাগদ ও সাম্রাজ্যবাদ এক ব্যক্তির মধ্যে যে সংকীর্ণ দৃষ্টি ও স্বার্থপরতার সৃষ্টি করে, পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ঠিক তা-ই জাগিয়ে তোলে সমগ্র জাতির মধ্যে এবং ইহার পরিণাম অন্তহীন যুদ্ধ ও সংঘাত ব্যতীত আর কিছুই হয় না। মজুরের অধিকার
মোট কথা, ইহা অনস্বীকার্য যে, ব্যক্তিগত মালিকানা অন্যকথায় ব্যক্তির স্ব-উপার্জিত ধন-সম্পত্তির উপর তাহার নিরংকুশ মালিক হওয়া এক ভয়ানক মারাত্মক ব্যবস্থা, তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই। ধন-সম্পত্তি সম্পর্ক এহেন বুনিয়াদী ধারণাই বর্তমান ধন-তন্ত্র, পুঁজিপতির ও জমিদারীর মার ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করিবার মূলীভূত কারণ। মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) এর বই

সম্পত্তির জাতীয়করণ

ব্যক্তিগত মালিকানার পরে দ্বিতীয় মত হছে জাতীয় মালিকানা। ইহার অর্থ এই যে, দেশের কোন ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবে কোন দিক দিয়াই কোন জিনিসের মালিক হইবে না; বরং দেশের ও জাতির যাবতীয় ধন-সম্পত্তির মালিক হইবে নির্বিশেষে ও সম্মিলিতভাবে দেশের সমগ্র জাতি। সাধারণভাবে কমিউনিজম ও মার্কসবাদের ধ্বজাধারিগণই এ মত পোষণ ও প্রচার করিয়া থাকে। এই মতের দৃষ্টিতে সমাজক্ষেত্রে বক্তির স্বতন্ত্র সত্তার কোনই গুরুত্ব নাই, সকল গুরুত্ব এবং সর্বময় কর্তৃত্ব একান্তভাবে সমাজের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ব্যক্তি সেখানে খাটে, মেহনত করিয়া উপার্জন করো, কিন্তু উপার্জিত সম্পদের মালিক সে হইতে পারে না, সমাজ তাহাকে তাহা হইতে বঞ্চিত রাখিয়া নিজেই একচ্ছত্র মালিক হইয়া বসে। ব্যক্তি তাহার মেহনত, যোগ্যতা ও মননশক্তি ব্যয় করিয়া তাহার বিনিময়ে সমাজের নিকট হইতে পেটভরা খাবার, পরিধানের বস্ত্র আর সম্ভব হইলে বাসস্থান লাভ করে। ফলত সে সমাজের চাকর, এই চাকরী হইতে সে মৃত্যু পর্যন্ত কখনও মুক্তি পাইতে পারে না। উপরন্তু তাহার এই নিরংকুশ ও একচ্ছত্র মনিব ও প্রভু তাহাকে এতটুকু সুযোগ দেয় না যে, সে নিজের দাবি অনুযায়ী নিজের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য আদায় করিতে চেষ্টা করিবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url