ইসলামে মানবাধিকার - মুহাম্মদ সালাহুদ্দীন

ইসলামে মানবাধিকার
পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃ.পূ. পঞ্চম শতকের গ্রীস থেকে; অতঃপর খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের
ইসলামে মানবাধিকার মুহাম্মদ সালাহুদ্দীন
প্রকাশনীঃ আধুনিক প্রকাশনী
বইয়ের সাইজঃ ৫-এমবি
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩১০
বিভাগঃ ইসলামে অধিকার
কৃতজ্ঞতায়ঃ বাগী কুঞ্জালয় পাঠাগার

মৌলিক মানবাধিকারের অর্থ

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। তার জাতিগত প্রকৃতিই তাকে স্বজাতির সাথে মিলেমিশে একত্রে বসবাসে বাধ্য করে। সে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অসংখ্য ব্যক্তির সেবা, মনোনিবেশ, সাহায্য ও আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী। শুধু নিজের লালন-পালন, অন্ন, বাসস্থান, পোশাক-পরিচ্ছদ ও শিক্ষা-দিক্ষার প্রয়োজনেই নয়, বরং নিজের প্রকৃতিগত যোগ্যতার লালন ও ক্রমবিকাশ এবং তার বাস্তব প্রকাশের জন্যও সে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে বাধ্য। যে সামাজিক জীবন তার চারপাশে সম্পর্ক ও বন্ধনের একটি প্রশস্ত ও দীর্ঘ শৃংখল তৈরী করে তা পরিবার, বংশ, পাড়া, শহর, দেশ এবং সামগ্রিকভাবে গোটা মানব গোষ্ঠী পর্যন্ত বিস্তৃত সম্পর্কের এই ছোটবড় পরিসরে তার অধিকার ও দায়িত্বও নির্ধারণ করে। মা-বাবা-সন্তান, ছাত্র-শিক্ষক, শাসক-কর্মচারী, ক্রেতা-বিক্রেতা, রাজা-প্রজার অসংখ্য পর্যায়ে তার উপর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয় এবং এর বিপরীতে সে কিছু নির্দিষ্ট অধিকার প্রাপ্ত হয়।

মৌলিক অধিকারের ইতিহাস

ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের যে ধারণা দিয়েছে এবং এসব অধিকার চিহ্নিত করে তার হেফাজতের যে ব্যবস্থা দিয়েছে তার উপর বক্তব্য রাখার আগে পাশ্চাত্য কর্তৃক রচিত মানবাধিকারের ইতিহাস, এসব অধিকারের উৎস সম্পর্কে পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাদের সরবরাহকৃত রক্ষাকবচসমূহের সর্বপ্রথম আমাদের মূল্যায়ন করে দেখা উচিৎ যে, আজ স্বয়ং পাশ্চাত্যে এবং তার অনুসারী অন্যান্য দেশে মানুষ কি পরিমাণে জানমালের নিরাপত্তা, ন্যায়-ইনসাফের প্রতিষ্ঠা, মান-সম্মানের হেফাজত, চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই মৌলিক অধিকার কতটা অবিচ্ছেদ্য এবং গত তিন-চারশো বছর ধরে এসব অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম অব্যাহত ছিল তা মানুষকে নিরাপদে, শান্তিতে ও সম্মানের সাথে জীবনযাপনের কতটা সুযোগ দান করেছে।

পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃ.পূ. পঞ্চম শতকের গ্রীস থেকে; অতঃপর খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তার সূত্র যোগ করে এক লাফে খৃস্টীয় একাদশ শতকে প্রবেশ করেন। খৃ. ষষ্ঠ থেকে দশম শতক পর্যন্তকার পাঁচশো বছরের দীর্ঘ যুগ তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা থেকে অদৃশ্য। তা শেষ পর্যন্ত কেন? সম্ভবত এজন্য যে, তা ছিল ইসলামের যুগ।

অধিকারের পাশ্চাত্য ধারণা

মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি মূলত এই জগতে মানুষের মর্যাদা, তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্কের ধরন এবং স্বয়ং এই বিশ্বজগতের সৃষ্টি এবং তার সূচনা ও পরিণতির তাৎপর্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার সাথে সংশ্লিষ্ট। মানুষের অধিকারগুলো কি? উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা না যাবে যে, পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত মানুষের মর্যাদা কি? অর্থাৎ অধিকারের প্রশ্ন মর্যাদার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের মর্যাদা অবগত না হয়ে বা এ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তে না পৌঁছে আমরা তার অধিকারগুলো চিহ্নিত করতে পারি না।

মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের পথনির্দেশ আমরা কেবল ওহী ভিত্তিক ধর্মগুলো থেকে পেতে পারতাম। কারণ আমাদের নিকট জ্ঞানের অন্য কোন নির্ভরযোগ্য উপায় বর্তমান ছিল না। কিন্তু মানুষ যখন ওহীর মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞানকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির সহায়তায় এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করে তখন এখান থেকেই ধারণা-অনুমান ও কল্পনার ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়ার এবং অজ্ঞতার মরিচিকায় হোঁচটের পর হোঁচট খাওয়ার সূচনা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর ইন্দ্রিয়ের উপর ভিত্তিশীল অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আওতার অনেক দূরে ছিল। লিখিত ইতিহাস-যা এই পৃথিবীতে মানব জীবনের সূচনার লাখো বছর পরে অস্তিত লাভ করেছে- এসব সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে নিজের রেকর্ডে কোন তথ্য পেশ করতে অক্ষম ছিল।

এই গভীর অন্ধকারে ওহীর আলো থেকে বঞ্চিত এবং সত্যের সাথে অপরিচিত জ্ঞান যখন ফিকির-ফন্দি ও চাতুরীর দ্বারা জীবনের জটিল সমস্যাগুলোর জট খুলতে চেষ্টা করে তখন সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি সামনে এলো যে, কোথা থেকে আলোচনার সূচনা করা যায়? জ্ঞান-বুদ্ধির সামনে যেহেতু গ্রহণযোগ্য স্বতঃসিদ্ধসমূহ ছিল না যেগুলোর ভিত্তিতে তারা যুক্তিপ্রমাণ দাঁড় করাতে পারত, তাই বাধ্য হয়ে তাদেরকে সূচনাবিন্দু হিসাবে স্বকপোলকল্পিত থিসিস, আদর্শ ও তত্ত্ব কায়েম করে তার উপর আলোচনার ভিত্তি রাখতে হয়। বুদ্ধি তো এভাবে একটি অনির্ভরযোগ্য বিশ্বাস ও কল্পনার উপর ভিত্তিশীল আলোচনার পথ অবলম্বন করে নিজের সমস্যা দূর করল, কিন্তু সে মানবজাতির সামনে উদ্ভূত সমস্যাবলীর কোন সন্তোষজনক সমাধান খুঁজে বের করায় সাফল্য লাভ করতে পারল না। তার পেশকৃত অস্পষ্টতা, স্ববিরোধিতা, অসংলগ্নতা এবং গুরুতর চিন্তা ও মতবাদের বোঝা এই সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলল। আর এভাবে মানবতা অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার আবর্তে ফেঁসে যেতে থাকে। কুরআন মজীদ জ্ঞান-বুদ্ধির এই দৈন্যদশার প্রতি ইংগিত করে বলেঃ

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url